যেমন প্যারেন্টিংয়ে ১৮ বছর বয়সে গুগলে চাকুরি পেলেন স্ট্যানলি

টেকশহর কনটেন্ট কাউন্সিলর: ক্যালিফোর্নিয়ার পাওলো অল্টো হাই স্কুল থেকে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেছেন স্ট্যানলি ঝং। বয়স এখন ১৮ বছর। বর্তমানে তিনি প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। এখানে এসে ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে গুগলের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার! যেখানে গান হাই স্কুল থেকে স্ট্যানলি খুব কষ্টে জিপিএ চার দশমিক ৪২ উঠিয়েছেন এবং এসএটি’তে করেছেন ১৫৯০ স্কোর।

স্নাতকোত্তার ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি এমআইটি এবং স্ট্যানফোর্ডসহ মোট ১৮টি কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেছিলেন। যারমধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠান থেকেই তাকে প্রত্যাখান করেছে। স্ট্যানফোর্ড বা এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাখাত হওয়া খুব বেশি অবাক করার মতো বিষয় না হলেও দেখা গিয়েছে ও অনেক স্থানীয় সাধারন কলেজও তাকে ভর্তির সুযোগ দেয় নি। এ অবস্থায় গুগলে চাকুরির সুযোগ পাওয়া রীতিমতো বিস্ময়করই বটে।

গুগলে স্ট্যানলি এলফোর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করবেন। অস্থায়ী এ পদে কাজ করার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে যোগ দিবেন। তবে সবাই অবাক হলেও স্ট্যানলির বাবা ন্যান ঝং এতে মোটেও বিস্মিত নন। সিএনবিসিকে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘দশ বছর বয়স থেকেই তাকে আমি কোড লিখতে দেখতাম। তাই সে যখন গুগলে চাকুরির সুযোগ পেলো অবাক হই নি। ’ ন্যান নিজেও গুগলে কাজ করেছেন সফটওয়্যার ম্যানেজার হিসেবে।

একজন সন্তানের বেড়ে উঠার পেছনে তার মা-বাবার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। সন্তানকে বড় করার ধরনের ওপর তার ভবিষ্যত সাফল্যের অনেকটাই নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতেই পারে স্ট্যানলির ছোটবেলাটা কিভাবে গড়ে তুলেছেন তার মা-বাবা। এ প্রসঙ্গে বাবা ন্যান জানিয়েছেন, কোডিং চর্চা অথবা স্কুলে ভালো ফলাফলের জন্য কখনোই স্ট্যানলিকে চাপ দেয়া হয় নি। বরং তিনি সন্তানকেই সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো স্বাধীন পরিবেশ দিয়েছেন।

সন্তানের এই ভালো সাফল্যের জন্য তিনি আরো যা করেছেন-

জটিল দিকনির্দেশনা নয় পাশে থাকুন

সন্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার অর্থ এই নয় মা-বাবা হিসেবে তার জীবন থেকে আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। স্ট্যানলির বাবা ন্যানের কাছে এর অর্থ সন্তানকে তার পছন্দের বিষয়টি নিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করতে দেয়া। ন্যান বলেন, ‘স্ট্যানলি যদি কোন কিছু নিয়ে কাজ করতে চাইতো আমরা তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করতাম। সে সঠিক কোন পথে যেতে চাইলে আমরা সেখানে আলো ধরেছি। তবে সে কিভাবে পথ চলবে অথবা পথ পরিবর্তন করবে কিনা পুরো বিষয়টিই তার ওপরে ছেড়ে দিয়েছি।’

এ প্রসঙ্গে উদাহারন হিসেবে স্ট্যানলির দাবা খেলার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ন্যান। চার বছর বয়স থেকে স্ট্যানলি দাবা খেলা শুরু করে। ওয়াশিংটন স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে তার বয়সী দলের মধ্যে পুরস্কার জিতে নেয়। এছাড়া ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপেও স্ট্যানলি নবম স্থান দখল করেছিলেন বলে জানায় তার বাবা। দাবা খেলায় জেতার জন্য স্ট্যানলির বাবা তার জন্য একজন কোচ নিয়োগ দেন। কোচ স্ট্যানলিকে পরবর্তী বছরের জাতীয় দাবা খেলা জিতিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে স্ট্যানলি তার কোচকে জানায় আমি দাবা খেলা থেকে অবসর নিয়েছি।

ন্যান বুঝতে পারছিলেন না অনেক বছর চর্চার পর দাবা খেলায় দক্ষতা অর্জন করেও স্ট্যানলি কেন তা ছেড়ে দিতে চাইছে। তবে তিনি এ বিষয়ে পুরোপুরি শান্ত ছিলেন। ন্যান বলেন, ‘আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। সে অন্য কিছু করতে চেয়েছিলো। আমরা তার কাজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করেছি।’

সন্তানকে ভাগ্যবান হতে সাহায্য করুন

ন্যান বলেছেন, সন্তানের চাকুরির জন্য নিজের নিয়োগকর্তার কাছে কোন ধরনের দেন দরবার করিনি। তিনি আরো জানান, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমার প্রবেশের কোন উপায় ই নেই। এই প্রক্রিয়া খুব খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করা হয়। ’ অবশ্য আমি বলবো আরো পাঁচ বছর আগে থেকেই স্ট্যানলি গুগলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে যখন থেকে সে র‍্যাবিটসাইন নামে একটি স্টার্ট আপ চালু করে। তার এই স্টার্টআপের বিষয়টিই নিয়োগকর্তাদের আকৃষ্ট করে; তবে এ ধরনের দায়িত্বের জন্য স্ট্যানলির বয়স খুবই কম ছিলো।

স্ট্যানলি যখন হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের নিয়োগকর্তাদের থেকে একটি নোট পায়। সেখানে তাকে এক বছর আগে গুগলের নিয়োগের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। এরপর সে নতুন ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ন্যান বলেন, ‘স্ট্যানলি এই অর্থে ভাগ্যবান অ্যামাজন এডব্লিউএস এর দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। যা তাকে গুগলের চাকরিটি পেতে সাহায্য করেছে।’ স্ট্যানলির বাবা হিসেবে ন্যানের কাজের অংশ ছিলো এসব সৌভাগ্যের মুহুর্তের জন্য ছেলেকে তৈরি হতে সাহায্য করা। যাতে করে সুযোগ আসার সাথে সাথে সে গ্রহন করতে পারে।

‘দ্য লাক ফ্যাক্টর’ বইয়ের লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের মনোবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড ওয়াইজম্যান বলেছেন, আপনি কাউকে উৎসাহ দেয়ার মাধ্যমে সাহায্য করতে পারেন। ইতিবাচক প্রচেষ্টাকারী হয়ে উঠতে হবে।

নেতিবাচক প্যারেন্টিং বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেনিফার ব্রিহেনি ওয়ালাস বলেছেন, প্রাপ্ত বয়স্করা ইতিবাচক প্রচেষ্টাকারী হয়ে উঠলে শিশুদের সাফল্য আসে। স্ট্যানলির ক্ষেত্রে ন্যানও এ পথ অবলম্বন করেছেন। ইতিবাচক প্রচেষ্টাকারীরা সফল হওয়ার জন্য স্ব-অনুপ্রাণীত হয়ে থাকে। তারা কখনো বিশ্বাস করে না সাফল্য মানুষ হিসেবে তাদের মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করবে।

বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত গ্রেড বা পুরস্কার নয়, মানুষ হিসেবে কেমন এবং নিজস্ব সম্প্রদায়ের লোকজন তাকে কিভাবে দেখছে এ বিষয়টিই যে প্রধান তা সন্তানদের মধ্যে গেঁথে দিতে হবে। ওয়ালাস বলেছেন, ‘এগুলো চাপ ও বিষন্নতার বিরুদ্ধে ঢালের মতো কাজ করবে। বিষয়টি এমন যে ইতিবাচক প্রচেষ্টাকারীরা কখনো ব্যর্থ হয় না। এটি মূলত তাদের সবকিছু থেকে উপরে ও স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করে।’

তিনি আরো জানান, সন্তান যখন কঠিন পরিস্থিতিতে থাকে তখন তার পাশে থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিতে হবে। অনেকগুলো স্কুল যখন স্ট্যানলির আবেদন ফিরিয়ে দেয় ন্যান তখন ভর্তির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি কোন বিষয়গুলো দেখেছে সেসব নিয়ে আরো স্বচ্ছতা পেতে কাজ করতে থাকেন।

ন্যান বলেন, ‘আমরা শুধুমাত্র বলে গিয়েছি , শুধুমাত্র আমাদেরকে বলুন যে কি নেই?’ কারণ আমি মনে করি ব্যর্থ হয়ে গিয়েছি এ ধরনের চিন্তাভাবনাই মা-বাবার হতাশার সবচেয়ে বড় অংশ। আর এসময় সন্তানরাও মনে করে তারা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।’

সিএনবিসি/আরএপি



from টেক শহর https://ift.tt/e3RZUW8
নবীনতর পূর্বতন