ইউকে এআই সেফটি সামিট কি পারবে এআই নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ দূর করতে ?

টেকশহর কনটেন্ট কাউন্সিলল : প্রযুক্তি বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিদ্রুত বিকাশে প্রশ্ন উঠছে এটি আমাদের মানবতাকে রক্ষা করবে নাকি ধ্বংস করবে? তবে ঠিক কি ঘটতে যাচ্ছে তা এ বিষয়ক বিশ্বের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরাও বলতে পারছেন না।

এ অবস্থায় এআই এর বিকাশ বন্ধ করে দেয়া হবে নাকি যেমন আছে চলতে থাকবে তা নিয়ে দুই ধরনের মতই রয়েছে। এআই নির্মাতাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন প্রযুক্তিটির অতি দ্রুত উত্থানের কারণে এটি নিয়ে কাজের গতি কমিয়ে দিতে হবে অথবা সাময়িক সময়ের জন্য তা একেবারে স্থগিত করে দেয়া উচিত।

আবার বাকিরা মনে করেন এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার অর্থ প্রযুক্তিটির মাধ্যমে নতুন ওষুধের ফর্মূলা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁজার মতো চমৎকার সব অর্জনকে থামিয়ে দেয়া।

এআইয়ের এসব সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে আগামি সপ্তাহে বিশ্বের প্রায় শতাধিক নেতা, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধান, শিক্ষাবিদ এবং এআই গবেষক যুক্তরাজ্যের ব্লেচলি পার্ক ক্যাম্পাসে সমবেত হচ্ছেন। তারা এখানে এই শক্তিশালী প্রযুক্তিটির ঝুঁকি কমিয়ে কিভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা নেয়া যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবেন।

ইউকে এআই সেফটি সামিট শীর্ষক অনুষ্ঠানে বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। এই ঝুঁকিগুলো তথাকথিত ‘ফ্রন্টেয়ার এআই’ এর সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি এআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ও উন্নত সিস্টেম; যা এই মুহুর্তে উদ্ভাবিত না হলেও তা খুব দ্রুতই তা চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অবশ্য সমালোচকরা বলছেন দুইদিনের এই মিটিংয়ে এই মুহুর্তে এআই নিয়ে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তার ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। যেমন- এআই নির্মাণে বর্তমানে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে এই প্রযুক্তি।

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সরকার এআইয়ের সম্ভাব্য কিছু ভয়ংকর ঝুঁকির তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব হুমকির মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা, এআই দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রন এবং শিশু যৌন নির্যাতনে ডিপফেইকের ব্যবহার বৃদ্ধি।

অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করে ‘ঘুম নষ্ট না করার’ অভিযোগ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। তিনি যুক্তরাজ্যকে এআই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতার স্থানে নিয়ে যাওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। যার অংশ হিসেবেই আয়োজিত হচ্ছে সম্মেলনটি। বিশ্বের প্রথম এআই সম্মেলনটির যখন ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো তখন অনেকেই তা শেষ পর্যন্ত হবে কিনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

সম্মেলনে অংশ নিতে বিশ্বের শীর্ষ ব্যক্তিরা সত্যিই কি তীব্র শীতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের থ্যাংকসগিভিং অনুষ্ঠানের পূর্বমমুহুর্তে ইংল্যান্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে ভ্রমন করবেন? সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অতিথিদের তালিকা এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় নি। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের সব নেতারা যে অংশ নিচ্ছেন এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত।

বাণিজ্যিক খাত থেকেও সম্মেলনে অংশগ্রহনের উৎসাহের কোন কমতি দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি স্ট্যাবিলিটি এআইয়ের প্রধান এমাদ মোসতাক এ সম্মেলনটিকে যুক্তরাজ্যের এআই সুপারপাওয়ার স্ট্যাটাস অর্জনের ‘এক প্রজন্মের সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারসহ অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের আমরা এই ইকোসিস্টেমের নিরাপত্তার রক্ষার বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছি। ব্রিটেনকে এক্ষেত্রে নিরাপদ ও প্রতিযোগিতা সক্ষম রাখতে দীর্ঘমেয়াদি থেকে স্বল্প মেয়াদি ঝুঁকিগুলো নিয়ে করপোরেট ল্যাব , প্রতিদিনের গবেষকদের কাজ করতে হবে। ’

এআই কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিটি নির্মাণ প্রতিযোগিতায় রয়েছে তাই তাদের এই আলোচনায় যোগ দেয়া খুবই প্রয়োজন। অবশ্য মনে রাখতে হবে এ ধরনের আলোচনা আগেও হয়েছে। সেক্ষেত্রে সম্মেলনের আলোচনায় আরো বৈচিত্র আনতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, ইউরোপিয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ইউরসেলা ভন দের লিয়েন সম্মেলনে অংশ নিবেন। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ সলজ আসছেন না। চীনকে আমন্ত্রন জানানো হলেও অংশ নিবে কিনা নিশ্চিত নয়। সম্মেলনে যাচ্ছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস।

কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন সম্মেলনে ভুল কিছুকে অগ্রাধিকার দেয়া হতে পারে। তারা বলছেন যেমনটা ভাবা হচ্ছে তারচেয়েও অনেক বেশি হুমকি রয়েছে; যা অনেকের জন্য চরম উদ্বেগের।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্ব্রিজের অধ্যাপক গিনা নেফ বলেছেন, ‘আমাদের চাকুরি, আমাদের সংবাদ এবং পরস্পরের সাথে যোগাযোগ সক্ষমতার ক্ষেত্রে কি ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। আমরা সাধারন মানুষ, বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং খোলাখুলি বলতে গেলে পুরো বিশ্বের উপর হুমকি নিয়ে চিন্তিত।’

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এআই খাতকে একা পরিচালনার জন্য কম্পিউটিং অবকাঠামোতে চার বছরে নেদারল্যান্ডসের একটি দেশের আকারের বিদ্যুত খরচ হয়। তবে এ ইস্যুটি সম্মেলনে আলোচনা করা হবে না। এআই এরইমধ্যে কর্মক্ষেত্রে কালো ছায়া ফেলেছে। এআই পরিচালিত চ্যাটজিপিটি এখন কপিরাইটের কাজ করছে। ফলে কপিরাইটারদের চাকুরি এখন হুমকির মুখে।

এই শক্তিশালী সিস্টেমকে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ডাটা সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। এসব ডাটার বিস্তারিত মালিকানাধিন বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো সুকৌশলে আড়ালে রাখে। এসব ইস্যু সম্মেলনে উপস্থাপন করা হলেও তা খুব একটা গুরুত্ব পাবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে এই দুইদিনের সম্মেলন থেকে আমরা কি পাবো?

বড়জোর আশা করা যেতে পারে এখানে ‘ব্লেচলি পার্ক এগ্রিমেন্ট’ নামে একটি চুক্তি হবে এবং বিশ্ব এআই সৃষ্ট বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে।

এআই গডফাদার হিসেবে পরিচিত তিনজনের একজন অধ্যাপক ইয়োশোয়া বেনগিও। তিনি ফ্রন্টেয়ার এআই মডেলগুলোর জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে কোন কিছু অনিরাপদ মনে হলে তা প্রত্যাহারযোগ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি এটিও বলেন, এ ধরনের কোন কিছু করতে হলে দুইদিনের বেশি সময় লাগবে।

বেনগিও বলেন, ‘আমাদের ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্যে যাত্রা শুরু করলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতাগুলো অনেক লম্বা সময় নেয়। ছোট করে হলেও কাজ শুরু করা উচিত এবং এজন্য জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।’

বিবিসি/আরএপি



from টেক শহর https://ift.tt/aC84ERM
নবীনতর পূর্বতন